মার্জিন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অনেকটা কমেছে- কায়েস

0
31

লংকাবাংলা পুঁজিবাজারের একটি পরিচিত নাম। লংকাবাংলা নামে আর্থিক খাতে একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খন্দকার কায়েস হাসান। শেয়ার বিজ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। বিনিয়োগবার্তার পাঠকের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হলো।

► দীর্ঘ মন্দার পর পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিককালে উত্থান ও পতন সম্পর্কে কিছু বলুন

কায়েস হাসান: শেয়ারবাজারে অনেক দিন ধরে তেমন কোনো গতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিককালে বাজার উত্থানের পেছনে কিছু বিষয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে যখন মার্কেট পতন হয়, তখন কিছু বিষয় জড়িত ছিল। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয় করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অন্যতম। নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোর তাদের সীমার মধ্যে বিনিয়োগ করার জন্য তৎপর ছিল। আগে ব্যাংকগুলো মোট দায়ের ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারতো। নতুন আইনে ইক্যুয়িটির ২৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগই নয়, রয়েছে সাবসিডিয়ারির বিনিয়োগও। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যেসব সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজে যে পরিমাণ ইক্যুয়িটি দেয়, তা এক্সপোজার লিমিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্লেসমেন্ট শেয়ারের বিনিয়োগ, মার্জিন ঋণ তো আছেই। তাছাড়া নন-লিস্টেড কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত। গত ডিসেম্বরে এর সময় শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এক্সপোজার লিমিটেডের বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেয়। সংগঠনের উদ্যোগে আমরা যখন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে বিষয়টি তুলে ধরা হলে সরকার উদ্যোগ নেয়। ফলে বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে। তবে সম্প্রতি মুদ্রানীতি ঘোষণার পর বাজার স্বাভাবিকভাবে কিছুটা নি¤œমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তবে তা সাময়িক। বাজার আবারও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

► পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ অনেক কম। এর কারণ কী বলে মনে করছেন?

কায়েস হাসান: আসলে আমাদের দেশে ব্যবসার ৯০ শতাংশ মূলধন ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়। অন্যান্য দেশে যা নেওয়া হয় পুঁজিবাজার থেকে। আর এ কারণে আমরা অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে। আমাদের দেশে ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে অনেকেই মূলধন নিচ্ছে না। দেশে সে ধরনের প্র্যাকটিস এখনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। আমাদের দেশে পারিবারিক কোম্পানির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বের হতে পারছেন না মালিকরা। দেশের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ছোট থেকে বড় হয়েছেন। যার জন্য নিজের কোম্পানির মালিকানা অন্য কারও কাছে দিতে চান না। ফলে বাজারে ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ কম।

► শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো যায় কীভাবে?

কায়েস হাসান: মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো সবসময়ই চায় ভালো কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসতে। ক্যাপিটাল মার্কেটে আসার জন্য সব প্রসেস থেকে শুরু করে আসার পরে কী হবে তার একটা প্ল্যান থাকে। যেখানে এক থেকে দেড় বছরের মতো লাগতে পারে। ডিউডিলিজেন্স পদ্ধতিতে আসতে হয়তো দশ থেকে বারো মাস লাগতে পারে। তবে ইস্যুয়ার যদি দেখে প্রসপেক্টাস সাবমিট করার পর অনেক সময় লাগছে। কোম্পানিগুলো এ সময়ক্ষেপণকে ঝামেলা মনে করে বিরক্ত হয়। আসলে তারা জটিলতা চায় না, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাতে হয়ে যায় এমনটিই চায় প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া কোম্পানির দেওয়া তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে। এতেও বেশ সময় চলে যায়। বিশেষ করে তাদের জনবল ঘাটতি থাকার কারণে এমনটি হচ্ছে। যত দ্রুত করা দরকার সেভাবে হচ্ছে না। আর এ কারণে ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি এসব প্রক্রিয়া আরও সহজ করা যায়, তাহলে ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে উৎসাহী হবে। আবার অনেকে অপেক্ষা করছে একটার বুক বিল্ডিং হচ্ছে দেখি তার কী অবস্থা, পরে এ পদ্ধতি ভালো হলে তার মাধ্যমে আসবে অনেকে।

► ইস্যু আনার ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

কায়েস হাসান: আইপিও প্রিপেয়ারনেস বিষয়ে কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রস্তুত রাখে না। তারা ব্যবসা করে, তাছাড়া তারা নিজেদের মতো করে অনুমোদিত মূলধন বাড়ায়। বাজারে আসার জন্য তাদের যেসব নিয়মকানুন মানতে হয় তার মধ্যে অনেক কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। যেসব কোম্পানি আসতে চায় তাদের বিভিন্ন তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেক লিস্ট অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। ভালো কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময় তথ্য দেওয়াকেও বিরক্ত মনে করে কখনও কখনও। তারা এসব তথ্য না দিয়ে ব্যাংক থেকে লোন নেয়; কারণ পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া সহজ।

তবে মার্চেন্ট ব্যাংককে যদি ব্যাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছাকাছি পর্যায়ে নিতে হয়, তবে মার্চেন্ট ব্যাংকের কাস্টমারও বাড়বে। এজন্য মার্চেন্ট ব্যাংকের রিসোর্স প্রয়োজন। আর দেশে রিসোর্সের অনেক অভাব রয়েছে। রিসোর্স বাড়ানো হলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে ব্যাংকগুলো থেকে বাইলেটারাল লোন অনেকটা কমে আসবে। পুঁজিবাজার বাইলেটারাল নয়, তাই বন্ড ইস্যু করলে অনেকগুলো সাবস্ক্রাইবার থাকবে। তখন কমপ্লায়েনস বাস্তবায়ন হবে বেশি।

► বর্তমান বাজারে সূচক ৩০০ পয়েন্ট পড়েছে, সেটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক?

কায়েস হাসান: বাজার দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এটাকে খুব বেশি অস্বাভাবিক বলা ঠিক হবে না। কারণ বাজারে গত পাঁচ বছরে ৬০টির ওপরে কোম্পানি এসেছে। কোম্পানিগুলোর অর্থনৈতিক গ্রোথের সঙ্গে ইনডেক্সের গ্রোথ হওয়াটা স্বাভাবিক। গত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ইনডেক্সের তেমন গ্রোথ হয়নি। ২০১২ সালে কিছুটা হয়েছিল তারপর আর তেমন বাড়েনি। তবে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণ, আমানতের সুদের হার কমাসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের ইতিবাচক বক্তব্যে বাজার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে। তবে মনিটরিং পলিসি ঘোষণার পর বাজার কিছু পড়েছিল, আসলে বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তো গুজবের পেছনে ছোটেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক যখন বলছে কিছু নজরদারির কথা তখন সাধারণ মানুষ মনে করলো বাজার স্বাভাবিক বাড়ছে, এটা মনে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাচ্ছে না। আর এ কারণে সেল প্রেশার বেড়ে যায়। এতে সাময়িক সময়ের জন্য পতন হয়েছে।

► মুদ্রানীতির কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না?

কায়েস হাসান: মুদানীতি ছয় মাস সামনে রেখে করা হয়। তার প্রভাব ওইদিনই পড়ে। আর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হুজুগের মানসিকতা থাকার কারণে বেশ কিছুদিন এ ধারা অব্যাহত ছিল। তবে বাজার আবারও উত্থান ধারায় ফিরেছে।

► বাজার উত্থান-পতনে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে?

কায়েস হাসান: বাজার যখন পড়ে তখন মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর তাদের গ্রাহকের দিকে বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কারণ মার্কেট ভলিয়ম যখন কমে যায়, তখন বিনিয়োগকারীদের বলতে হয়, তোমার শেয়ারদর কমে যাচ্ছে বিক্রি করে আমাদের ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করো। শেয়ার বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কিছুটা কমানোর জন্য তাগিদ দেওয়া হয়।

► মার্জিন ঋণ সম্পর্কে কিছু বলুন।

কায়েস হাসান: অনেক বিনিয়োগকারী ২০১০ সালে জমিজমা বিক্রি করে এনে বাজারে বিনিয়োগ করেছেন। তখন মার্জিন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান বাজারে মার্জিন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অনেকটা কমেছে।

► ইস্যু আনার ক্ষেত্রে কোন কোন দিক প্রাধান্য দেন?

কায়েস হাসান: ব্যাংকগুলোর যেভাবে কাজ করে সেভাবে আমাদের মার্চেন্ট ব্যাংক কাজ করতে পারে না। ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবাই তার কাস্টমার হতে পারে। সেদিক দিয়ে আমাদের কাছে তাদের ৫ শতাংশ কাস্টমার হতে পারে। যেমন ধরুন একটা ব্যাংকের কাছে বিশটি কোম্পানি ঋণ নিতে আবেদন করে। তার মধ্যে ১৯টিকে ঋণ দেয়। সেক্ষেত্রে আমরা একটি কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনের যোগ্য মনে করবো।

আমাদের কাছেও অনেক কোম্পানি বাজারে আসার জন্য প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু আমরা সব কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য যোগ্য মনে করি না। অনেক ছোট কোম্পানি আছে, যারা বলে আমরা কীভাবে বাজারে আসব, কীভাবে হিসাবের বিভিন্ন তথ্য বেশি দেখিয়ে আসা যায়। আমরা তাদের বাজারে আসার জন্য নিরুসাহিত করি। কারণ সব কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্তির যোগ্যতা থাকে না। এছাড়া আমরা ছোট মূলধনি কোনো কোম্পানিকে আপাতত বাজারে আনছি না। আমরা মূলত দেখি যাদের ভিত্তি ভালো, ব্যবসায়িক সুনাম আছে। হিসাবের দিক দিয়ে স্বচ্ছতা আছে এমন কোম্পানির ইস্যুকে আমরা প্রাধান্য দিই। আমরা মূলত বড় ধরনের স্বচ্ছ কোম্পানি বাজারে আনার জন্য চেষ্টা করি। সেক্ষেত্রে বিএসইসির নির্দেশনাকে আমরা প্রাধান্য দিয়েই ইস্যুগুলো তালিকাভুক্তির আবেদন করি। বর্তমানে অনেক কোম্পানির মধ্যেও ফার্মাসিউটিক্যালস, স্টিল, আইটি, সিমেন্ট খাতে যারা তালিকাভুক্ত হয়নি তাদের আনার চেষ্টা করছি। আসলে আইপিও প্রসেস লম্বা প্রসেজিং। যারা ব্যবসার ওনারশিপ ধারণ করে তাদের কনভেনস করা খুবই কঠিন কাজ। তাদের বোঝানো থেকে শুরু করে মার্কেটে তালিকাভুক্তিতে রাজি করাতে অনেক সময় লাগে।

► চলতি বছর বিনিয়োগকারীদের ঋণ নেওয়াকে কতটা প্রাধান্য দিচ্ছেন?

কায়েস হাসান: নেগেটিভ ইক্যুয়িটির কারণে মার্জিন লোন কম দিচ্ছি। আগের কাস্টমারদের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। জানুয়ারি থেকে মার্জিন ঋণ নেওয়া ১০ শতাংশ বেড়েছে।

► লংকাবাংলার বিশেষত্ব কী? স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘময়াদি লক্ষ্যমাত্রা কী?

কায়েস হাসান: প্রথমেই বলবো, বোর্ডের কেউ কাস্টমারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। এদিক থেকে লংকাবাংলা শতভাগ কমপ্লায়েনস পরিপালন করছে। বর্তমান পুঁজিবাজারের দিক থেকে লংকাবাংলা একটি বড় প্রতিষ্ঠান। দশ বছর ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ব্রোকার হিসেবে এক নম্বারে অবস্থান করছে লংকাবাংলা। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ইস্যু ম্যানেজমেন্টে ২০১১ সালের পর থেকে ফান্ড উত্তোলনের দিক থেকে নাম্বার ওয়ানে স্থান করে নিয়েছে লংকাবাংলা। বুক বিল্ডিংয়ে মাধ্যমে আইপিও আনার ক্ষেত্রেও আমরা শীর্ষ স্থানেই রয়েছি। এর মধ্যে বুক বিল্ডং পদ্ধতি সংশোধনের পর আমরা টেকনোলজিকে নিয়ে এসেছি লংকাবাংলা। এছাড়া ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে, মার্জার ইস্যু, আইপিও নিয়ে কাজ করছি। আর এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীরা আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here