ভালবাসার আরেকটি বাড়ি ছিল বাংলাদেশে

0
70
আমেরিকায় বসবাসরত বাড়ীর সামনে লেখক

রিমি রুম্মান

প্রতিদিন কতই ঘটনা ঘটে। কেউ লেখে, যা স্মরনীয় হয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু বিষয় হারিয়ে যায় কালের আবর্তে। কিছু স্মৃতি নিয়ে কিছু কথা ফেস বুকে তুলে ধরেছেন রিমি রুম্মান। পাঠকের উদ্যেশ্যে তা তুলে ধরা হলো:

২০০০ সনে এখানে ওখানে বাড়ি খুঁজতে গিয়ে শেষে এ বাড়িটি পছন্দ হয়ে যায়।
শুধু সামনের সবুজ উঠোন, নানান ফুলের গাছ আর ব্যলকনিটুকু মনে ধরে যায় ভীষণভাবে। সে রাতে কামাল কাজ শেষে ফিরলে বলি, এটিই কিনবো, এটাই চূড়ান্ত।সে আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়। আমি রাতভর ম্যাপ এঁকে বুঝাই ডুপ্লেক্স বাড়িটির আনাচ-কানাচ। সম্যক ধারনা দেই লিভিং রুম, বেডরুম, বেইজমেণ্ট, পার্কিং গ্যারেজ সহ চায়নিজ প্রতিবেশী সব, স-ব। উত্তেজনা আর দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে রাতটুকু ভোর হয়।

সেই থেকে আমাদের টোনাটুনি’র সংসারের দ্বিতীয়বেলা এ বাড়িটিতেই। এখানেই আমাদের সন্তান রিয়াসাত, রিহানের জীবনের শুরু, এবং বেড়ে উঠা। আত্মীয়, অনাত্মীয় অনেকেরই আমেরিকা জীবনের শুরু এ বাড়িটিতে। যারা স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে এদেশে আসেন, তাঁদের একটু গুছিয়ে উঠবার আগ অবধি স্বল্পকালীন আবাসস্থল।

এখানে ব্যলকনিতে বসে শীতের আকাশ দেখা, তুলার মত তুষারের ঝরে পড়া দেখা, ঘন বর্ষণ দেখা কিংবা পূর্ণিমা রাতে উঠোন ভেসে যাওয়া জ্যোৎস্না দেখা __ এ এক অদ্ভুত ভালোলাগাময় অনুভূতি। ভরদুপুরের খাঁখাঁ রৌদ্রের সময়টুকুতে পৃথিবী যখন ক্ষণিক থেমে থাকে, ঠিক তখন সবুজ উঠোনটি হয়ে উঠে আমার পাখি দেখার দ্বিতীয়বেলা।

বছরের ছুটির সময়গুলোতে যখন নিউইয়র্কের বাইরের শহরে বেড়াতে যাই, ভালো লাগে বিকেল অবধি। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনালেই বাড়িগুলোয় নেমে আসে মধ্যরাতের নিরবতা। ঝিঁঝিঁ ডাকে অবিরাম। আশেপাশের ঘুমন্ত বাড়িগুলো থেকে অন্ধকার ঠিকরে ঠিকরে পড়ে। রাতগুলোকে মনে হয় পৃথিবীর এক একটি দীর্ঘতম রাত। সেইসব প্রাসাদে রাতভর নির্ঘুম এপাশ এপাশ করতে করতে তীব্র ভাবে অনুভব করি, কি গভীরভাবেই না আমি আমার শহর আর বাড়িটিকে ভালোবাসি।
……

আমার ভালোবাসার আরেকটি বাড়ি ছিল, বাংলাদেশে। বাবার বাড়ি।
আমার জন্ম এবং বেড়ে উঠা মফঃস্বল শহরের সেই বাড়িটি। অনেক কষ্টে সৃষ্টে দু’দিকে ব্যলকনি সমেত একটি বাড়ি বানালেন বাবা। পাড়ার গণ্যমান্য মানুষ প্রিন্সিপ্যাল সাহেব আর চৌধুরী সাহেব একজোট হয়ে অভিযোগ আনলেন বাড়িটির ব্যলকনি আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। নানান টেনশন, উত্তেজনা, নির্ঘুম রাত শেষে একদিন সন্ধ্যার কিছু পরে আব্বা-আম্মা গেলেন তাঁদের বাসায়। বাড়িটির নির্মাণে যে আকাশসীমা লঙ্ঘন করা হয়নি, এর পক্ষে নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করলেন। চৌধুরী সাহেব কিছু জায়গা দখলে নিয়েছিলেন অনেক বছর আগে। কথা ছিল বাড়ি নির্মাণের সময় তা ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু শেষ অবধি তিনি কথা রাখেননি। এখন আমার বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। বেঁচে নেই চৌধুরী সাহেব। বেঁচে নেই প্রিন্সিপ্যাল সাহেবও। তাঁরা মিশে গেছেন পৃথিবীর গহীন মৃত্তিকায়। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে আজও।

প্রতিটি বাড়ি ঘিরে এমন কতশত আবেগ, স্বপ্ন কিংবা স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প আছে।
কিন্তু বেলাশেষে আমাদের খালি হাতেই ফিরে যেতে হয় একই ঠিকানায়।
কি অদ্ভুত এই জীবন এবং জীবনের গল্প, তাই না ?

ভালো থাকুন সকলে।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here