‘দ্রুত ধনী হবার প্রবণতা বাদ দিয়ে, প্রযুক্তিগত বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে’-জায়েদুল করিম চৌধুরী

জায়েদুল করিম চৌধুরী চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পলাশ চৌধুরি গ্রুপ

ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি বেশ ঝোক ছিল তাঁর। দৈনিক জনতা, ইত্তেফাক, জনপদ, জনকন্ঠ, রুপালী পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। লেখালেখি নিয়ে এক সময় অনেক আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছিল তাকে নিয়ে।পড়ালেখার পাশিপাশি মনোযোগি ছিলেন ব্যবসার দিকে। পড়ালেখা শেষ করে চূড়ান্ত ভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যবসা করবেন। একদিন মায়ের কাছে গিয়ে ব্যবসার করবেন বলে জানালেন।আবদার করলেন কিছু টাকার।কিন্তু মা’ এর কাছে তেমন টাকা ছিলো না, ছেলের আবদার পূরণ করতে লুকানো টাকা থেকে বের করে দিলেন ৫৫ টাকা।শুরু হলো পথচলা। মায়ের দেয়া অর্থ ও দোয়া নিয়েই ব্যবসায়ির খাতায় নাম লেখালেন। সেই পথচলা আজ এসে দাড়িঁয়েছে গ্রুপ অব কোম্পানিতে। বলছিলাম পলাশ চৌধুরী গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জায়েদুল করিম চৌধুরী (পলাশ চৌধুরী)’র কথা।

জগন্নাথ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক পাশ করা সফল এই উদ্যোক্তা ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের জনক। ছেলে সিয়াম ইবনে চৌধুরী ও মেয়ে ইফরানা বিনতে চৌধুরী। দু’জনেই লন্ডনে লেখাপড়া করছে।
জায়েদুল করিম চৌধুরীর সফল হওয়ার গল্প জানতে তাঁর সাথে মুখোমুখি হয়েছিল বিনিয়োগ বার্তা’র বিশেষ প্রতিনিধি মাসুদ রানা।

আলাপচারিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু বিনিয়োগ বার্তার প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলোঃ-

 

আলাপচারিতায় পলাশ চৌধুরি ও বিনিয়োগ বার্তা’র বিশেষ প্রতিনিধি মাসুদ রানা

বিনিয়োগ বার্তা: আপনার লেখাপড়া, শৈশব এবং ব্যবসার শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : বলতে গেলে ছোট বেলা থেকেই ব্যবসা শুরু করি। শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে ব্যবসা করতাম। দুটো বিষয় একসঙ্গে চলত। আমার ব্যবসার বড় ধরনের কোনো পুঁজি ছিলো না। এসএসসিতে বাংলায় প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রে লেটার মার্ক পেয়েছিলাম। একদিন মা কে বললাম আমি ব্যবসা করতে চাই। মা বলল আমি টাকা পাব কোথায়? তখন মা আমাকে ৫৫ টাকা দিলেন। মায়ের দোয়া নিয়েই আমার ব্যবসায় পথ চলা। টুকটাক ব্যবসা করতে করতে যখন দেখলাম পুঁজি কিছুটা বেড়েছে তখন শুরু করলাম ঠিকাদারি ব্যবসা । প্রথমে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত হলাম।যারমধ্যে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এসব প্রতিষ্ঠানে তালিকাভুক্ত ঠিকাদার হিসেবে কাজ করা শুরু করলাম। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কাজ করার সুযোগ হলো।বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাই সিকিউরিটি সফটওয়ার, কম্পিউটার অটোমেশন, এমআরআই স্ক্যান মেশিন আমার প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা। তারপর কনজ্যুমার প্রডাক্টের ব্যবসা শুরু করলাম। মা ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট দিয়ে ব্যবসা শুরু করলাম। যেমন- মা চিনিগুড়া চাল, মা ড্রিংকিং ওয়াটার, কহিনুর লাচ্ছা সেমাই, কহিনুর নুডুলস।প্রথমে দেশের ভেতরেই বাজারজাত শুরু করলাম।পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূলতার কারণে দেশ থেকে বিদেশে ব্যবসার দিকে মনোযোগি হলাম। বিদেশে বাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকায় ব্যবসা শুরু করি। যা খুব ভাল চলছে। দেশের আবহে প্রবাসীরা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের স্বাধ পাচ্ছে।

বিনিয়োগ বার্তা: অতিসম্প্রতি আপনি মালয়েশিয়া সরকারের প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে স্বস্ত্রীক মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন, সেসম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?

জায়েদুল করিম চৌধুরী: মালয়েশিয়ার জহুর বারু প্রদেশের ইকো স্প্রিং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন এ মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন দলের প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমের সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করে ক্ষমতাসীন দল। সেই অনুষ্ঠানে আমি ও আমার সহধর্মিনী বেগম নাছরীন চৌধুরী একমাত্র বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হিসেবে আমন্ত্রন পাই। নৈশভোজের প্রাক্কালে আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে আমার একান্ত আলোচনা হয়। উক্ত নৈশ্যভোজে মালয়েশিয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার দাতো রশিদ, জাতীয় সংসদ সদস্য নাত্রা বিনতে ইসমাইল, সংসদ সদস্য ডাক্তার চৌং ফেজ, মহিলা বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য মিসেস নাফসহ অন্যান্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি, সদস্যবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীগণ উপস্থিত ছিলেন।

নৈশভোজে আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে পলাশ চৌধুরি ও তার সহধর্মিনী বেগম নাছরীন চৌধুরি

বিনিয়োগ বার্তা: আপনারতো ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের ব্যবসা রয়েছে, দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে আপনার পরামর্শ কি?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : আমি পর্যটন শিল্পের জন্য কাজ করতে চাই। আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পের বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। তার পাশাপাশি কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এর মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। একারনে আমাদের পর্যটন শিল্প ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। একটা বাসার ড্রইং রুম যেমন সে বাসার সৌন্দর্য্য বহন করে। আমি মনে করি সে দেশের রাজধানী একটি বাসার ড্রইং রুমের মত। তাই রাজধানীর যানজটের কারণে অনেক পর্যটক এদেশে আসতে চায় না। পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটাতে নিরাপত্তার বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। এছাড়া আমাদের ডমেস্টিক এয়ারলাইন্সের সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধি করতে হবে । অবকাঠামো উন্নয়ন, যানজট, বিদেশীরা যেন হয়রানীর সম্মুখিন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিদেশী পর্যটকদের কাছে আমাদের পাহাড়ীদের তৈরী হ্যান্ডিক্রাফটস, কুটির শিল্প খুবই পছন্দের।এসব বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা জরুরী। আমি দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে কথা চলছে। উভয় দেশের সংস্কৃতি আদান-প্রদানের মাধ্যমে যাতে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটনো যায়। এ শিল্পের প্রসার ঘটাতে হলে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।

বিনিয়োগ বার্তা: ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্তমানে দেশের সম্ভাবনাময় ব্যবসা কোনটি বলে মনে করছেন?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : আমাদের দেশের কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজার চলে গেছে বিদেশীদের হাতে। দেশের মানুষ বিদেশী পণ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তবে এখন আইটি সেক্টর খুবই সম্ভাবনাময় একটি খাত। তথ্য প্রযুক্তির বিশ্বায়নের যুগে বর্তমানে বিশ্ব সবার হাতের মুঠোয়। প্রয়োজনের তাগিদে বাংলাদেশ তথ্য প্রবাহের সাথে যোগ হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মিডিয়াবান্ধব ব্যক্তিত্ব। তিনি যে সাবলীল ভাষায় মিডিয়ার সামনে সরাসরি কথা বলেন তা বিশ্বের অন্য কোন দেশের প্রধানদের ক্ষেত্রে তেমন একটা দেখা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের সান্নিন্ধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। ব্রুনাই সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যে যে মিডিয়া নিতে চায় দিয়ে দাও, মিডিয়া এখন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি মিডিয়া বান্ধব একজন সরকার প্রধান। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে বলে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই তিনি মিডিয়ার বিষয়ে এমন উদাঢ় চিন্তা করতে পেরেছেন।

বিনিয়োগ বার্তা: আপনি শ্রম বাজার উন্নয়নের কথা বলছিলেন, বিস্তারিত বলুন ?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : আমি যখন দেখি বিদেশের মাটিতে দেশের মানুষ কষ্ট করছে তখন খুবই খারাপ লাগে। বিশেষ করে যখন দেখি তাদের অদক্ষতার জন্য নির্যাতন ও বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে, তখন খুবই কষ্ট পাই। দক্ষ জনগোষ্ঠি বিদেশীরা মূল্যায়ন করে। আমাদের দেশের মানুষ যারা প্রবাসে রয়েছে তাদের অধিকাংশই অদক্ষ। তারা ভাষা জানে না, কাজ জানে না । তাই বেশি নির্যাতনের স্বীকার হয় । তাই যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের জন্য একটা ইন্সটিটিউট করতে চাই। ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে তাদেরকে চাহিদা অনুযায়ি দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই। যাতে দেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে কাজ করতে পারে, নির্যাতনের স্বীকার না হয়। তার প্রাপ্য তিনি বুঝে পান। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের পরিমানও বাড়বে।

বিনিয়োগ বার্তা: চ্যানেল বায়ান্ন’র বিষয়ে জানতে চাই ?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : গত ২রা এপ্রিল রাজধানীর একটি হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে যাত্রা শুরু করেছে আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘চ্যানেল বায়ান্ন’। তথাকথিত ইউটিউব চ্যানেল থেকে একেবারেই ভিন্নতর হবে চ্যানেল বায়ান্ন । বিদেশী কয়েকটি কোম্পানীর প্রযুক্তিগত সহায়তা থাকবে এ চ্যানেলে। আমরা প্রতিদিন ১২ ঘন্টা সরাসরি আর ১২ ঘন্টা পুনঃপ্রচার করব। প্রতিদিন নতুন অনুষ্ঠান থাকবে। আমেরিকা, ইউরোপে যেমন বাংলা টিভি আছে এদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সেখানে গিয়ে সরাসরি কথা বলেন। আমি মালয়েশিয়ায় তেমন একটি স্টুডিও করব। চ্যানেল বায়ান্ন’মাধ্যমে আমরা শোনাব তাদের কথা। ফুটে উঠবে সেখানকার প্রবাসীদের কথা। খুব শীঘ্রই সম্প্রচার শুরু হবে। প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রতিভা তুলে ধরা হবে। এতে থাকবে রিয়েলিটি শো অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয় এর আন্তরিক প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এসেছে। এই প্রযুক্তির কল্যাণে চ্যানেল বায়ান্ন উপভোগ করতে পারবে এদেশের মানুষ।

চ্যানেল বায়ান্ন উদ্বোধনের মুহূর্ত

বিনিয়োগ বার্তা: নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার কি পরামর্শ থাকবে?

জায়েদুল করিম চৌধুরী : নতুন প্রজন্মের জন্য সুস্থ কর্ম পরিবেশ ও প্রতিভা বিকাশে সরকারকে কর্মপদ্ধতি বের করতে হবে। যাতে করে তরুণ প্রজন্মকে নতুন নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তোলা যায়। সরকার এর মধ্যে এমন অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে আইটি সেক্টরে দক্ষ প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি যেকোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। আর নতুন প্রজন্মকে আমার একটাই পরামর্শ থাকবে ‘তাড়াতাড়ি ধনী হবার প্রবণতা বাদ দিয়ে,কারিগরি ও প্রযুক্তিগত বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তবেই সমৃদ্ধি আপনার কাছে ধরা দিবে।

বিনিয়োগ বার্তা: ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেবার জন্য।

জায়েদুল করিম চৌধুরী : আপনাদেরও ধন্যবাদ, ধন্যবাদ বিনিয়োগ বার্তা পরিবার ও পাঠকদের।
ইন্টারভিউ ভিডিও

বিনিয়োগ বার্তা/এস/

আপনার মতামত দিন :

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here