করোনায় শপিংমল দোকান খোলা কতোটুকু নিরাপদ!

225

ভয়াবহ করোনা আতঙ্কে যেখানে প্রতিদিনই আক্রান্ত আর মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। সাধারণ মানুষের আক্রান্ত আর মৃত্যুর গণনায় প্রতিনিয়ত সংখ্যা বেড়েই চলছে। এ অবস্থায় যদি একটার পর একটা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাহলে পরিণতি কী হতে পারে; সেটাই ভাবার বিষয়। আ প্রস্তুতিই বা কতোটুকু রয়েছে আমাদের। তাছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বেশকিছু মার্কেট রয়েছে। যেখানে লোকসমাগম বেশি হয়- এসব মার্কেটগুলোতে উপচেপড়া ভীড় লেগেই থাকে। এ ক্ষেত্রে শপিংমলগুলো সামলে নেয়া যতোটা সহজ। কিন্তু এ ধরনের লোকসমাগম মার্কেটগুলোতে ক্রেতা কন্ট্রোল করাটা ততোটা সহজ নয়। মার্কেটে ক্রেতা প্রবেশের ক্ষেত্রেও হিমশিম খেতে হবে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের।

সম্প্রতি করোনা আক্রান্তে পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তারও মৃত্যু গণনা থেকে বাদ পড়ছে না। যুক্ত হয়েছেন সরকার দলীয় সাংসদও। আর এমন এক ভয়াবহ দুর্যোগে পর্যায়ক্রমে গার্মেন্টস, কারখানা, শপিংমল, দোকানপাট সবই খুলে দেয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্তে এখনো সমালোচনার কমতি নেই। এই সিদ্ধান্তের সাথে পাল্লা দিয়ে নতুন যুক্ত হলো শপিংমল, দোকানসহ ব্যবসাকেন্দ্র।

কিন্তু কথা হচ্ছে, আমাদের সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ বাহিনী সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রতিদিনই রাস্তায় পাহারা দিচ্ছেন। ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কোনক্রমেই পারছেন না মানুষকে সচেতন করতে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই মুহূর্তেই লাপাত্তা। আবার চলে গেলে আগের জায়গায়ই। এক রকম ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে। অন্যদিকে সুযোগ পেলেই নানা অজুহাতে বের হচ্ছেন মানুষ। প্রশাসন জীবনবাজী রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সাধারণ মানুষকে ঘরমুখো করতে পারছে না।

ঘরমুখো না হবার পেছনে ত্রাণেরও সংশ্লিষ্টতার কথা না বল্লেই নয়। ঢাকাসহ সারাদেশে ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগেরও কমতি নেই। অধিকাংশ এলাকায়ই স্থানীয় কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেম্বাররাও নাকি মুখ দেখে, মুখ খুঁজে ত্রাণ দিচ্ছেন। এটা মানুষের অহেতুক অভিযোগ নয়। সত্যটা আয়নার মতো পরিস্কার। সেই সাথে গরীবের ত্রাণ চোরের সংখ্যাও বাড়ছে। যদি ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে যেত। তাহলে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষের সংখ্যাও কমে যেত। সেটা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শতভাগ সঠিক নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ত্রাণের দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে সেনা-পুলিশদের। হয়তো অনেক এলাকায়ই স্বস্তি পেত সাধারণ মানুষ। ভাগ্যেও জুটতো কিছু খাবার।

এরই মধ্যে সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশে দোকানপাট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, হাটবাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট ও শপিংমলগুলো ১০ মে থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটার মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। তবে ৫ টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে প্রতিটি শপিংমলের প্রবেশের ক্ষেত্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত সতর্কতা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

আবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারি অফিসে ছুটির মেয়াদ ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সীমিত পরিসরে যেভাবে ব্যবসা কেন্দ্রগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে। মূলত ঈদকে সামনে রেখে শর্তসাপেক্ষে আগামী ১০ মে থেকে সীমিত আকারে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কিন্তু কথা হচ্ছে, যেখানে করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি ও তাদের স্বজনরা প্রতিনিয়ত নানা অভিযোগ করে আসছেন। এ অবস্থায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে কতোটুকু সামাল দিতে পারবে এসব হাসপাতালগুলো। রোগিদের সাথে অবহেলা, ভোগান্তি; এমনকি করোনা টেস্টের রেজাল্টেও বিভ্রান্তি। তার মানে, আমরা করোনা মোকাবেলায় পুরোপুরি প্রস্তুত নই। গুছাতে সময় লাগবে। এটাই মেনে নিতে হবে। কিন্তু এ অবস্থায় যদি পর্যায়ক্রমে সবকিছু খুলেই দেয়া হয়। তাহলে সরকার কীভাবে সামলাবেন! যেখানে ক্ষুধার সমাধান হয়নি, হয়নি করোনা চিকিৎকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, নিশ্চয়তা। পুলিশ ভাইয়েরা সেবা দিতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করছেন। এরই মধ্যে ৫ টি প্রাণ চলে গেল। হিমশিম খাচ্ছে সরকার। সেখানে দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত কতোটুকু যুক্তিসংগত!

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন আরও ৭৮৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯২৯ জনে। অাজ দুপুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। এ সময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৮৩ জনের আর নতুন সুস্থ হয়েছেন ১৯৩ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১৪০৩ জন।

এ অবস্থায় দোকানপাট শপিংমল চালু মানেই, মানুষ ঘর থেকে বের হতে আর বাঁধা থাকলো না। তাহলে মানুষকে ঘরে রাখার যে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলছিল। সাথে প্রচার প্রচারণাও। দোকানপাট চালুর কারণে যে লোকসমাগম হবে। কীভাবে এটাকে সমন্বয় করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেন মাঠ পর্যায়ের সেনা-পুলিশ। সেটাই দেখার বিষয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত যে সংগ্রাম করে যাচ্ছিল তারা। পথে পথে লোকসমাগমে প্রশাসনের এতোদিনের চেষ্টা যেন ঝিমিয়ে না পড়ে। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠান খোলা মানেই আক্রান্তের পথগুলো আরো সহজ করা। কিন্তু এর শেষ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে! কোন ভুল সিদ্ধান্তে মৃত্যুর মিছিল যেন আরো ভারি না হয়। আসলে করোনা আমাদের সবকিছু উলট-পালট করে দিয়েছে। কোথায় ব্যর্থতা, কোথায় সফলতা সেটাও স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। তাই সংকটকালীন সময়টাতে সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তই অনেক বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবকিছু ভালো ভালোই হোক। এটাই প্রত্যাশা আমাদের।

লেখক: সাংবাদিক
জাফরুল আলম

 

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here